বায়োলজিতে পড়ার সুবাদে বর্তমান পরিস্থিতিতে আমার কি উচিৎ? একজন পেছনের সারির ছাত্র হিসেবে আমার এখন চিন্তা করা দরকার প্রচুর। পরীক্ষার আগের রাতেও চিন্তা করেছি এইবার কোন কৌশল অবলম্বন করলে স্যারদের চোখ ফাঁকি দেয়া সহজ হবে! পরীক্ষার খাতাটা উন্নত করার কোন চিন্তা মাথাতে ছিল না, ছিল শুধু পাশ মার্কটা কিভাবে আদায় করা যায়, কে পাশে বসলে বেশি সুবিধা পাওয়া যায়!

তাহলে প্রথম সারির শিক্ষার্থীরা নিশ্চয় এতদিনে বিজ্ঞানী হয়ে গেছে? না, এমনটা হয়নি। হয়তো হবেও না। কিন্তু কেন?

ধরেন, আপনি এখন ভাত আর সবজি রান্না করবেন। সামান্য চালও আছে, বাজার থেকে কিছু সবজিও কিনেছেন। সমস্যাটা হল বাড়িতে হাঁড়িপাতিল নেই, চুলা নেই। এমনকি লাকড়িও নেই। এখন আপনি রাস্তা থেকে লাকড়ি কুড়িয়ে পাশের বাড়ি থেকে হাঁড়িপাতিল ধার করে আরেকজনের বাড়িতে গেলেন রান্নার জন্য। আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ে যারা থিসিস করে তারা এই ঘটনার সাথে বেশ পরিচিত। এভাবেই তাদের গবেষণার কাজ করতে হয়।

এখন আলস সময় পার করছি। সিলেবাসটা খুলে ব্যবহারিক কোর্সগুলো দেখছিলাম। নিচে কয়েকটা নাম লিখলাম যেগুলো দেখার পর অবাক না হয়ে থাকা যায় না।

১) স্পোর স্টেইনিং, ফ্লাজেলা স্টেইনিং, নেগেটিভ স্টেইনিং
২) আশেপাশে পাওয়া যাওয়া লাইকেন
৩) স্যাফ্রানিন, ফাস্ট গ্রিন, অ্যাকোহল গ্রেডস, জাইলল, ক্লোভ ওয়েল প্রস্তুতি।
৪) ডিমের অসমোসিস দ্বারা অসমোসিস প্রদর্শন
৫) ফিক্সেটিভস প্রস্তুতি
৬) পেডিগ্রি এনালাইসিস
৭) ফটোশপ (কম্পিউটার কোর্সে এইটাও আমাদের ছিল ভাবতেই হাসি পাই)
৮) কেমিক্যাল এনালাইসিসের অনেকগুলো পদ্ধতি
৯) বিভিন্ন রকম বাফার সল্যুশন প্রস্তুতি
১০) গুড়ো হারবাল ঔষধ প্রস্তুতি
১১) নিউক্লিয়ার এবং প্লাসমিড ডিএনএ পৃথকীকরণ
১২) এগারোজ জেল ইলেক্ট্রোফোরেসিস
১৩) ইষ্ট ব্যবহার করে পাউরুটি প্রস্তুতি
১৪) কাঁচা দুধের মান নির্ধারণ টেস্ট
১৫) পাকা ফলে এনজাইম, কার্বোহাইড্রেট এবং প্রোটিন পরিমাপ নির্ণয়
১৬) ব্যাকটেরিয়া চিহ্নিত করার জন্য কিছু বায়োকেমিক্যাল টেস্ট
১৭) বিভন্ন এনজাইম প্রস্তুতিকরণ আর পৃথকীকরণ
১৮) মিউটেশন
১৯) পিসিআর দ্বারা নির্দিষ্ট ডিএনএ সিকোয়েন্সের সম্প্রসারণ

এইগুলার মধ্যে ৭৫% যে সিলেবাসে ছিল এটাই জানতাম না। আর বাকি ২৫% মুখস্ত করছি, ব্যবহারিক করার মতো ল্যাব নেই। বাদ পড়ে যাওয়া এসব পরীক্ষার মধ্যে অনেকগুলাই বেশ মজার অথচ জীবন তেনা তেনা হয়ে গেছে কোয়াড্রেট করতে করতে।

একবার একটা এক্সপেরিমেন্ট করার পর রং হবার কথা বেগুনি কিন্তু দেখা যায় ঘোলাটে। পরে দেখা গেল ব্যবহৃত কেমিক্যালটি ছিল মেয়াদোত্তীর্ণ। আবার এমনও একবার হয়েছে কেমিক্যাল এর বদলে ব্যবহার করেছি পানি। খুবই হাস্যকর। ল্যাবের উপর নির্ভর করে থাকা একটা ডিপার্টমেন্টের যদি ল্যাবই না থাকে আর যা আছে এতে যদি প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র না থাকে তো এর থেকে বড় কৌতুক আর কি হতে পারে!

বিশ্ববিদ্যালয়ে আসার আগে দেখতাম বিশ্ববিদ্যালয়য়ের শিক্ষকেরা নোবেল পুরষ্কার পাই। এই থেকেই ধারনা ছিল আমাদের দেশের বিশ্ববিদ্যালয়য়ের শিক্ষকেরা নোবেল পুরষ্কার পান আর না পান অন্তত বিজ্ঞানী হয়ে থাকবেন।

এখানে আসার পর ভুল ভাঙছে। এনারা কাগজ দেখে বোর্ডে টুকে যেটা ক্লাস ফাইভের বাচ্চাও করতে পারে। এনারা স্লাইড বানিয়ে এনে চালু করে পড়তে থাকে। আর আমরা টুকতে থাকি সজোরে যেটা আমাদের সাহায্য করে অন্যের খাতার দিকে তাকিয়ে নিজের খাতাতে লেখা চালিয়ে যাওয়া।

এরপরও কিছু শিক্ষক মনে করেন ছাত্রদের বিজ্ঞানী না বানিয়ে ছাড়বেন না, মধ্যবিত্তের শখ আরকি। দেশের লোক মনে করে ঐ যে হবু বিজ্ঞানীর দল বেরিয়েছে। দেশ এবার উদ্ধার হবে।

আমাদের ডিপার্টমেন্ট থেকে অনেক বিসিএস ক্যাডার হয়। শিক্ষকেরাও এটাকেই তাদের সফলতা বলে চালাতে পছন্দ করেন। কিন্তু এটাই তাদের বড় ব্যর্থতা। প্রচার করে বরং তাদের ব্যর্থতাটাকেই বাজারে ছেড়ে দেন। ওনারা তো শেখান না শরীরের কোন অংশে বাড়ি দিলে আসামি দ্রুত অপরাধ শিকার করবে, তাহলে পুলিশ হওয়াতে ওনাদের অবদান কোথায়? ওনারা তো শেখান না মাথার কোন অংশটাকে কাজে লাগিয়ে দেশের অধিক উন্নতি করা যাবে, তাহলে প্রশাসনে ঢুকলে ওনাদের অবদান কোথায়? ওনারা নিশ্চয় আইনকানুনও শেখান না, তাহলে?

পদার্থ, রসায়ন, গণিত প্রচুর পড়লেও বায়োলজিতে স্কুল-কলেজে প্রচুর ফাঁকি দিয়ে এসেছি। এই গ্যাপটা পুরনের জন্য সৃষ্টিকর্তা বিশ্ববিদ্যালয়ে বায়োলজিতে পড়ার সুযোগ করে দেন। এরপর বিশ্ববিদ্যালয়য়ের শিক্ষকদেরও খারাপ অবস্থা দেখে তিনি সন্ধান দেন গুগল, ইউটিউবের। কিন্তু এই দিয়ে যে দেশ উদ্ধার করা সম্ভব নয়। পা পিছলে পড়ে এখন কোমর ভাঙ্গা যে!

Leave a Reply