ঘুম ঘুম চোখে ক্লাসে ঢুকি। সর্বোচ্চ ডিগ্রীধারী গুরুজনদের একপেশে তত্ত্বীয় কথাগুলো একঘেয়েমির তীক্ষ্ণ ফলা হয়ে ঢুকে এফোঁড়ওফোঁড় করে দেয় মস্তিষ্কের মানচিত্র। চারপাশটায় চোখ বুলালে মনে হয় – ভুল করে হয়তো ঢুকে পরেছি কোন কিন্ডারগার্ডেনে।
অসহ্য ক্লান্তি নিয়ে বের হয়ে যাই মুরাদ চত্ত্বর।
ফার্স্ট ইয়ারে যেখানে যাওয়ার প্রবল ইচ্ছা থাকা সত্যেও ফাঁপড়ের ভয়ে যাওয়ার সাহস হাতড়ে ফিরতে হতো।
দূর থেকে ঈর্ষাকাতর চোখে দেখতাম সিনিয়রদের চা খাওয়া আর আয়েশী ভঙ্গিতে সিগারেটের ধোঁয়া ছাড়া…
ক্যাম্পাসের উদ্ভট কালচার মোতাবেক, এখন আমিও প্রমান সাইজের সিনিয়র!
তবুও ব্যাঙের ছাতার মত টং গুলোর চারপাশে গিজগিজ করা একদল অপরিচত মানুষগুলোকে দেখে ভয় হয়।এই বুঝি কেউ ফাঁপড় দেয়ার জন্য ডাক দেয়..
এই মানুষের ভাঁগাড় থেকে আমার সেই পরিচিত শীতের সকালের মুরাদ চত্ত্বরটাকে খুঁজি। পাই না।চারপাশটা আরো অপরিচিত হয়ে আসে।মন খারাপ হয়।সিগারেট নিয়ে বসি মহুয়া তলা।
ভেবে পাইনা; ক্যাম্পাসটাকে এতদিনেও কেন আপন করা গেল নাহ…!

সিগারেটের সাথে পাল্লা দিয়ে সময় ফুরায়।আমি হাঁটতে হাঁটতে চলে আসি ট্রান্সপোর্ট।
ফার্স্ট ইয়ারে যে জায়গাটাকে শাহবাগের ছবির হাঁট বলে বিভ্রম হতো।
ফার্স্ট ইয়ারের এই অহেতুক ফ্যান্টাসি কাটিয়ে দেয় গুটি কয়েক “মুই কি হনুরে ” তত্ত্বে বিশ্বাসী জ্ঞানী মানুষ।তাদের জ্ঞানী জ্ঞানী হাবভাব আর কথাবার্তার পাশাপাশি
চারপাশের সবাইকে বোকাচোদা ভাবার চাহনি দেখে নিজের অজ্ঞতা ঢেকে রাখার চেষ্টায় আমি সরে আসি।
বুঝে ফেলি; বিকৃত এই সময় গুলা আমার না।আমিও এই সময়ের না।

ছুটে যাই অরণ্যালয়ে।
অরণ্যালয়। যেখানে বিষাদ গুলোকে পাখি করা যায়।
সময় তার তীব্র স্রোতের টানে আরো কিছু বিষন্ন মুহুর্তের পাড় ভাঙে।আর আমি গভীর নিশ্চিন্তে ডুবে যেতে থাকি আনন্দময় শীতল অন্ধকার জলে।
আস্তে আস্তে আমার দুচোখ লাল হতে থাকে আর আমি একের পর এক গুনে যেতে থাকি বিষাদ পাখির সংখ্যা।
এক…দুই…তিন করে একঝাক বিষাদ পাখির ডানা ঝাপটানোর শব্দে মাথা ঝিমঝিম করে।
ঘোর লাগা পায়ে নেমে আসি ফুটপাতহীন ক্যাম্পাসের রাস্তায়।
হুট করে পুরো ক্যাম্পাসটাকে মনে হয়;
অতি প্রাচীনকালের যুদ্ধবিদ্ধস্ত কোন নগরী।
যে নগরে কিছুক্ষন আগে বেজে উঠেছে পাগলা ঘন্টা।যুদ্ধের সংকেত।ভয়াবহ যুদ্ধ।সবাই সেই যুদ্ধে জেতার তাগিদে মরিয়া হয়ে ছুটছে এদিক সেদিক।নিচ্ছে যুদ্ধের প্রস্তুতি।
সবার চোখে মুখে টিকে থাকার এই যুদ্ধে জিতবার হিংস্রতা।
আমার ভয় হয়। বুঝে উঠতে পারিনা,আমি কি করব?
এই যুদ্ধে যে আমি খুব বেশি অহেতুক।এতদিনেও শিখে নেয়া গেল না টিকে থাকবার রণকৌশল!

অতঃপর….
সবাই দেখে ঘোরলাগা পায়ে আমি এলোমেলো হাঁটি।
অথচ কেউ বোঝেনা; মনে মনে আমি ছুটে চলি… সমস্ত শক্তি দিয়ে দৌড়াই…
আমি পালাবার পথ খুঁজি।।

পুনশ্চঃ প্রিয় সঞ্জীব চৌধুরী,
এখন আমিও জানি, চোখটা কেন যে এত পোড়ায়।

Leave a Reply