ঘটনা গুলো কীভাবে শুরু করব আর কীভাবে জোড়া দিব তা নিয়ে একটু দ্বিধান্বিত। এক জৈষ্ঠ্যমাসের গোধুলীক্ষণে গেরুয়ার বাজারে দই চিড়া খেতে গিয়েছিলাম। এইটা ছিল বিকাশ পরবর্তী টাকা ভাংতি করার দইচিড়া। হঠাৎ তারা ওস্তাদের রিক্সার গ্যারেজের থেকে হট্টগোল। খাওয়া শেষে আয়েশ করে ঠোটে সিগারেট গুজে গ্যারেজের দিকে গেলাম৷ গিয়ে বুঝলাম ইসমাইল নামের একজন মহাজনের রিক্সা নিয়ে এক্সিডেন্ট করছেন। টাকা শোধ না করে আজ অন্য রিকশা নিয়ে বের হয়েও আজ কথামত টাকা শোধ করতে পারেনাই৷ ইসমাইল ভাইয়ের কাছে ১০০/- ঘাটতি। ইসমাইল সাহেব মুখবুজে সহ্য না করে তর্ক করায় তার গায়েও হাত পরে, এবং তাকে টাকা ছাড়া যেতেই দিবে না। পরে অনেকটা জোড় করেই ইসমাইল ভাইয়ের হাতে ১০০/- দিয়ে আসি। উনি শুধু এইটুকুই বলে যে ভাই আমি জীবন থাকতে আপনার এই উপকার শোধ করবই। আমি “লাগবেনা ভাই” মার্কা হাসি দিয়ে সেদিন চলে আসি।

তার কিছুদিন পরেই৷ আষাঢ় মাস, বটতলায় দাঁড়ায় আছি৷ রিকশা সংকট৷ অনেকেই অপেক্ষায় রিকশার। যে আগে “মামা খালি হবেন” বলতে পারে এমন একটা না বলা প্রতিযোগিতা৷ এই খেলার বেতাজ বাদশা হয়েও, একটু অন্যমনস্ক হয়ে যাবার কারণে একমাত্র রিকশাটাকে দুইটা মেয়ের ডাকের ৩-৪ সেকেন্ডের ব্যাবধানে আমি ডাক দেই। মেয়ে দুইটা বিজয়ীর মত তাচ্ছিলের হাসি হেসে রিকশায় ঊঠার সময় রিকশাওয়ালা যাবে না বলে আমার সামনে এসে বলল “মামা উঠেন”। আমি মূহুর্তের জন্যও কোন চিন্তা না করে টপ করে ঊঠে পরে মেয়েদুইটার দিকে তাকাবোনা করেও কেন জানি তাকালাম।
ঃ মামা চিনছেন আমারে?
ঃ হ্যা মামা চিনুম না ক্যান।
ঃ কন তো আমি কে?
ঃএকটু ইতস্তত করে বললাম মামা আসলে চিনিনাই।
ঃ মামা মনে আছে অনেকদিন আগে গেরুয়ায় আপনি আমারে টাকা দিয়া বাচাইছিলেন!
ঃ ও হ্যা মামা। মনে পরছে, মনে পরছে।

কথা বলতে বলতে সমাজবিজ্ঞানের ঢালে এসে মামার চেহারা দেখে পুরা তাজ্জব হয়ে গেলাম। শরীর খারাপের তুংগে সে। চেহারা ভেংগে একাকার। জিজ্ঞেস করে জানলাম যে অনেক অসুস্থ সে, আজ ১৪ দিন পর মোটামুটি বাধ্য হয়েই বের হইছে। ডেইরি এসে ভাড়া দিতে গেলে সে নিবেই না৷ শামসুল নামের এক রিকশাওয়ালা উনারে বুঝাইতে চেষ্টা করল যে তুই সুস্থ হইলে ১০ বার মামারে রিকশায় উঠাইয়া তোর ১০০/- শোধ করিস৷ কিন্তু আজ ভাড়াটা নে। শামসুল ভাই তখন ক্যাম্পাসের ১-২টা ইঞ্জিন রিকশার ১টা চালাইত। তাই শামসুল ভাইকে ভাল করেই চিনতাম তখন, ওনার নাম্বার ও সেইভ করা ফোনে৷ আমি শামসু ভাইয়ের কথায় সায় দিয়ে জোর করে পকেটে টাকা ঢুকায় দিয়ে চলে গেলাম সেদিনের মত।

তার এক-দেড় মাস পর একদিন। রাত ১০টার বেশি। বটতলায় বিকাশ নাই। এক্ষন না গেলে গেরুয়াতেও বিকাশ পাব না৷ রিকশা নাই তো নাই। হঠাৎ এক রিকশাওয়ালা হাজির। খালি মামা যাবেন বলার আগেই উনি প্যাডেল সামলে আমার সামনে ব্রেক করল। ওনারে নিয়া গেরুয়া গেলাম৷ ওনারে বলতে যাব মামা দাড়ান টাকা উঠায়ে আসব, তখনই দেখি এইটা ইসমাইল ভাই। কিছু বলতেই হইল না। হাতের সিগারেট ওনারে দিয়া টাকা উঠায়ে আসলাম। হালচাল জিগ্যেস করতে করতে বটতলায় নামায় দিয়া উনি ভাড়ার অপেক্ষা না করেই রিকশা ঘুড়াইতে শুরু করল। বলল “মামা আপনে আমার থেইকা ৮০ ট্যাকা পান এহন”। আমার কাছে ৫০০ টাকার একটা নোট ছিল খালি, তাই আর কথা না বাড়ায়া বললাম, আচ্ছা দেখা যাইব নে।

এক সপ্তাহও হয় নাই এর পর। সেদিন ডিপার্টমেন্টে যাব। সেমিস্টার ফাইনালের ভাইবা, আমার রোল লাস্টের দিকে। সুটেড-বুটেড হয়ে শামসুল ভাইকে কল করে বললাম ভাই হলের নিচে আসেন। ওই যে ঐ মেশিন রিকশাওয়ালা শামসু ভাই৷ ভাই আমারে নিয়া যাইতে যাইতে একটা কথা শুনাইলো। কথাটা হচ্ছে ইসমাইল ভাই, অর্থাৎ যারে আমি একসময় সাহায্য করছিলাম, সে নাকি আমি আর শামসু ভাই যেদিন তারে ডেইরি গেইটে বুঝায়া-শুনায়া টাকা ধরায় দিছিলাম, তার সপ্তাহখানেকের মাঝেই নাকি মারা গেছে। স্যুট পরে অনেক ঘামতেছিলাম। কিন্তু এই কথা শুনে থতমত খেয়ে পুরো শরীরটা ঠান্ডা হয়ে গেলো। শামসু ভাইকে বলতে গিয়ে মুখ দিয়ে বেরোলোই না যে আমি একদম তিনদিন আগেই, তিনদিনও না ৪৮ ঘন্টা আগেই তার রিকশায় করে আসলাম গেলাম। মাথায় শুধু বাজছে “মামা আপনে আমার থেইকা ৮০ ট্যাকা পান এহন”।

ব্যাপারটা হজম করতে কয়েকদিন লাগলো। অল্প কয়েকজন কাছের ভাইবন্ধুকেই বললাম। হাসি তামাশা করে বাদ দিলেও পরে আমরা তারা ওস্তাদের গ্যারেজের গিয়ে শামসু ভাইয়ের কথাটা যাচাই করেও দেখলাম। ইসমাইল ভাই আসলেই মারা গেছেন। উনি নাকি ক্যান্সারের ফোর্থ স্টেজে ছিলেন। ব্যাপারটা আর হাসির থাকলো না। শিরদাঁড়ায় একটা শীতল স্রোত কিছুখন পরপর বয়ে যেতে লাগলো।

তারপর একটা শীত আসলো, গেলো। আবার আরেকটা শীত। যথারীতি এই শীতেও বললাম, নাহ এর মত শীত আর দেখি নাই। সেদিন অফিস থেকে বের হয়ে শুভযাত্রা বাসে করে প্রান্তিক গেইট নামলাম ১১.৩০ এর দিক। ঘুমায় পরছিলাম তাই প্রান্তিক নামতে হইল। নিজেরে গালি দিচ্ছি আর ফাকা রাস্তায় হাটতেছি। কতটা রাস্তা বেশি হাটতে হবে। কই থেকে একটা নভেম্বর রেইন এসে বেয়াদবের মত ভিজায় দিয়ে আবার চলে গেলো! সোয়েটার শুদ্ধো ভিজে একদম দাতে দাত লেগেলেগে কাপছি। হঠাৎ একটা রিকশা এসে পাশে দাড়াইলো। কোন জন্মে কোন ভাল কাজ করছিলাম কে জানে। রিকশাওয়ালা বললো, “মামা আমি সালাম বরকত পর্যন্ত যামু ভাসানী হল পর্যন্ত যাইতে পারুম না”। আমি রিকশা পাইছি এতেই খুশি হয়ে ব্যাগ থেকে মাফলার বের করে মাফলারটা গামছার মত ব্যবহার করায় ব্যাস্ত তখন। সালাম বরকত হলের সামনে জেনারেটর রাস্তার দিকে এসে রিকশা স্লো হচ্ছে তখন জিজ্ঞেস করলাম “যাবেনই না মামা? বটতলা পর্যন্ত পারলে চলেন!”৷ থমথম কন্ঠে উনি বলল “ওইদিক আমার যাওয়া নিষেধ মামা!”
ব্যাগে মাফলার ঢুকায়ে মানিব্যাগ বের করব এমন সময় দেখি রিকশা ভাড়া না নিয়েই উনি জেনারেটর এর দিকে যাচ্ছে। আচ্ছা ভালো কথা, আমি ভাসানী হল থাকি এইটা উনি জানে কিভাবে এই বিষয়ে হালকা ভাবা শুরু করতেই মাথা ভারী-ভারী লাগতে শুরু করলো। রিকশাটা দূরে চলে যাচ্ছে আর একটা কণ্ঠ ভেসে আসছে

“মামা এহন আপনে আমার থেইকা ৭০ ট্যাকা পান”।

[প্যারানলমাল কাহিনির একটা পোস্ট ছিল। ঐ পোস্টের কমেন্টের জন্য অনেক সময় নিয়ে লিখলাম। পোস্টটা আর পাইলাম না! 🙁 ]

তাজিম
আইন ও বিচার, ৪২ ব্যাচ!

Leave a Reply